দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দুই বছর বন্ধ থাকার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) এ আয়োজনকে ঘিরে তিতাস নদীর দুই পাড়ে নামে অর্ধলক্ষ মানুষের ঢল। নৌকা বাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় মিলনমেলায়।
বাংলা সংস্কৃতির প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তিতাস নদীর শিমরাইলকান্দি-গাঁওগ্রাম পয়েন্ট থেকে মেড্ডা সরকারি শিশু পরিবার পয়েন্ট পর্যন্ত প্রতিযোগিতার সীমানা নির্ধারণ করা হয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ১০টি নৌকা চারটি পর্বে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
দুপুরের পর থেকেই নৌকা বাইচ দেখতে তিতাস নদীর দুই পাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। গাছের ডাল থেকে শুরু করে বাড়িঘরের ছাদ—দর্শকে পূর্ণ হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা। বাইচালদের তুমুল গতির প্রতিযোগিতা মুগ্ধ করে দর্শকদের। তিতাসের বুক চিরে বিজয়ের লক্ষ্যে অদম্য গতিতে ছুটে চলে মাঝি-মাল্লাদের নৌকা।
জারি-সারি গানের সুর, হেঁইও হেঁইও ধ্বনি, কাঁসি-করতালের তালে তালে বৈঠার ছন্দে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন ফিরে আসায় উৎসবে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে এসে নৌকা বাইচ উপভোগ করেন।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর প্রথম স্থান অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার শাপলা বয়েজ ক্লাব। প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল। জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজসহ অন্যরা।
প্রথম স্থান অর্জনকারী দলকে দুই লাখ টাকা, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে এক লাখ টাকা ও ট্রফি দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দলকে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
বাইচ দেখতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, অমর কথাসাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর সঙ্গে যে নদীর নাম জড়িয়ে আছে, সেই তিতাসে নৌকা বাইচের আমেজই আলাদা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নৌকা বাইচ ফিরে আসায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। তাঁরা প্রতি বছর তিতাস নদীতে এ আয়োজন করার দাবি জানান।
দর্শনার্থী মিলন মিয়া বলেন, ছেলে নিয়ে নৌকা বাইচ দেখতে এসেছেন। তাঁদের প্রাণের সঙ্গে নৌকা বাইচ মিশে আছে। যেখানেই বাইচ হয়, সুযোগ পেলেই সেখানে দেখতে যান।
সাত্তার মিয়া বলেন, নৌকা বাইচকে ঘিরে তিতাস নদীতে আবার প্রাণ ফিরেছে। নদী ও নদীর পাড় পরিষ্কার করা হয়েছে। বাইচ দেখতে পেরে তাঁরা খুব খুশি।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মাঝিরা বলেন, প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয় থাকবেই। তবে সবাইকে নিয়ে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় বিষয়। তাঁরা প্রতি বছর এ ধরনের আয়োজন চান।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৌকা বাইচের সংস্কৃতি আবার শুরু করতে পেরে তাঁরা আনন্দিত। প্রাণের এ উৎসব ধারাবাহিকভাবে চলবে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগীদের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এমন সময়ে নৌকা বাইচের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংস্কৃতির রাজধানী। নদীর দুই পাড়ের মানুষের উৎসবমুখর অংশগ্রহণই প্রমাণ করে তাঁরা নৌকা বাইচকে কতটা ভালোবাসেন। বাঙালি জাতির প্রাণের এ উৎসবের ঐতিহ্য ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এমএস/